কথাসাহিত্যিক মতি নন্দী
আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের ধারায় মতি নন্দী এক অন্যতম স্বতন্ত্র ধারার সূচনাকারী। শুধুমাত্র খেলাধুলাকে উপজীব্য করে ভারতে প্রথম গল্প-উপন্যাস রচনার পথিকৃৎ হিসেবে মতি নন্দী স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি ১০ জুলাই ১৯৩১ সালে উত্তর কোলকাতার তারক চ্যাটার্জি লেনে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম চুনীলাল নন্দী এবং মাতার নাম মলিনাবালা নন্দী। তিনি ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৫০ সালে আই এস সি, ১৯৫১ সালে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা এবং ১৯৫৭ সালে কোলকাতা বিস্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত মনীন্দ্রচন্দ্র কলেজ থেকে বাংলা অনার্সসহ বিএ পাশ করেন। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র মতি নন্দী ছিলেন মূলত ক্রীড়া সাংবাদিক এবং কথাসাহিত্যিক। তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় ক্রীড়া সাংবাদিক হিসাবে কাজ করতেন। আর এরই সুবাদে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেস, মস্কো অলিম্পিক, দিল্লি এসিয়ান গেমস প্রভৃতি খেলা কভার করেছেন। কিন্তু পেশায় সাংবাদিক হলেও সাংবাদিকতা তাঁর সাহিত্যজীবনকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। ১৯৫৭-তে ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর ‘ছাদ’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৫৮ সালে শারদীয়া ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘বেহুলার ভেলা’ গল্প প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ক্রীড়ামূলক সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য বলিষ্ট উপন্যাস ও ছোটোগল্পও রচনা করেছেন। তিনি শুধু বড়োদের জন্যই লেখালেখি করেননি, তারই পাশাপাশি ছোটোদের জন্যেও বেশকিছু উল্লেখযোগ্য কিশোর গল্প-উপন্যাসও রচনা করেছেন। এর মধ্যে ‘কোনি’, ‘কলাবতী সিরিজ’ খুবই উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৪-এ আনন্দ পুরস্কার এবং ‘সাদা খাম’ উপন্যাসের জন্য ১৯৯১-তে তিনি অকাদেমি পুরস্কার পান। ২০০০ সালে শিশু-কিশোর সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‘বাংলা অকাদেমি’ পুরস্কার পান। এছাড়াও ২০০২ সালে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘শরৎস্মৃতি’ পুরস্কারে ভূষিত হন। বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মতি নন্দী ৩ জানুয়ারি ২০১০ সালে তিনি মারা যান। তাঁর প্রয়াণে বাংলা ক্রীড়াসাহিত্য জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হলো ‘নক্ষত্রের রাত’ (১৯৫৮), ‘দুঃখের বা সুখের জন্য’ (১৯৭০), ‘স্ট্রাইকার’ (১৯৭৩), ‘স্টপার’ (১৯৭৪), ‘কোনি’ (১৯৭৫), ‘অপরাজিতা’ (১৯৮০), ‘সাদা খাম’ (১৯৯০), ‘ছায়া সরণীতে রোহিণী’ (১৯৯২), ‘সহদেবের তাজমহল’ (১৯৯৩), ‘মালবিকা’ (১৯৯৪), ‘শিবি’ (১৪০৩ বঙ্গাব্দ), ‘পূবের জানালা’, ‘দ্বাদশ ব্যক্তি’, ‘নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান’, ‘ফেরারী’, ‘কলাবতীর দেখাশুনা’, ‘গোলাপবাগান’, ‘বিজলিবালার মুক্তি’, ‘বনানীদের বাড়ি’, ‘বারান্দা’, ‘বাওয়াব’, ‘ছায়া’, ‘দ্বিতীয় ইনিংসের পর’, ‘ভালো ছেলে’, ‘ছোটবাবু’, ‘জীবন্ত’ প্রভৃতি।
‘উল্টোরথ’ পত্রিকায় ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি উপন্যাস’ প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল মতি নন্দীর ‘ধুলো বালির মাটি’ উপন্যাসটি। ‘ছাদ’ গল্পে সংসারে আবদ্ধ নায়িকার মানসমুক্তির কথা শুনিয়েছেন। ‘নক্ষত্রের রাত’ উপন্যাসে এই মুক্তির আস্বাদ এনেছেন নায়ক বিশ্ব ও নায়িকা রমার গভীর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। বিশ্ব সমকালের মধ্যবিত্ত হতাশ যুবক। তাই সে হতাশা ও অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত হয়ে প্রেমের বিশুদ্ধ আশ্রয়কেও বিশ্বাস করতে পারেনি। তাছাড়া পঞ্চাশের দশকের বেকারত্ব, কিম্বা সামান্য বেতনের অস্থায়ী চাকরি বিশ্ব-র মনকে দোলায়িত করে রেখেছে। তাই চাকরি যাওয়ার ভয়ে সে সুস্থভাবে রমাকে গ্রহণ করতে পারছে না। এই সংশয় ও সংকট রমার প্রতি ভালোবাসার ভিত্তিকেও নাড়া দিয়েছে।
‘স্ট্রাইকার’ উপন্যাসে দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিকূলতাকে জয় করার বাস্তবরূপ চিত্রিত হয়েছে। আবার ‘দ্বাদশ ব্যক্তি’ বা ‘ফেরারী’ উপন্যাসে মানুষের নিয়তি-লাঞ্ছিত অসহায়তার দিকটি বড় করে দেখানো হয়েছে। খেলার মাঠে যে জয়পরাজয় তা যেমন বড় নয়, তেমনি জীবন। এই মনুষ্য জীবনে কত টানাপোড়েনই না থাকে। এই একচিলতে জীবনে কখনো হাসি, কখনো কান্না, কখনো সুখের ছোঁয়া, কখনো দুঃখের গভীরতা, রয়েছে কখনো জয়ের উল্লাস, কখনো হারের গ্লানি তথা বিষণ্ণতা। আর এই কথাই কথাসাহিত্যিক মতি নন্দী তাঁর গল্প-উপন্যাসে বলতে চেয়েছেন।
তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্পগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘বেহুলার ভেলা’, ‘চোরা ঢেউ’, ‘অস্থায়ী পলায়ন’, ‘শবাগার’, ‘শেষ বিকেলের দুটি মুখ’, ‘ছটা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন’, ‘পর্দার নীচে একজোড়া পা’, ‘জীবনযাপন প্রনালী’, ‘গুণ্ডাদ্বয়’ প্রভৃতি।
মতি নন্দী তাঁর ‘বেহুলার ভেলা’ গল্পে দেখিয়েছেন, এক নিম্নবিত্ত পরিবারের কর্তা প্রমথ কঠিন অভাব তথা আর্থিক অনটন থাকা সত্ত্বেও নিজের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের মাংস খাবার ইচ্ছেটাকে পূর্ণ করে নিজেও মানসিক তৃপ্তি লাভ করেছে।
পঞ্চাশের দশকের বাংলাদেশের উত্তপ্ত পরিবেশে নাগরিক মধ্যবিত্ত মানুষের অসহায়তা ও উষ্মাকে তাঁর গল্পে তুলে ধরেছেন ‘চোরা ঢেউ’, ‘শবাগার’ প্রভৃতি গল্পে। ‘শবাগার’ গল্পে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময়ে মধ্যবিত্ত নায়ক মুকুন্দ ও তার পুত্রের থানায় যাওয়া, ছেলে মনুর ধরা পড়ে পুলিশকে গোপন খবর প্রকাশ করা এবং শেষ পর্যন্ত বাপের জন্য ছেলের এই পরিণতি তা সবই চিত্রিত হয়েছে। ‘বয়সোচিত’ গল্পে এক প্রৌঢ় ছাঁটাইয়ের ভয়ে অপিসের হাঁটার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। কিন্তু গল্পের শেষে আমরা দেখতে পাই, সে ভয় কাটিয়ে সেই প্রৌঢ় নিজেই অপিসে রিজাইন দিয়ে এসে তাঁর স্ত্রীকে জানান, আর রিটায়ার করাতে পারবে না। কারণ, তিনি নিজেই রিজাইন দিয়ে এসেছেন। এইভাবে তিনি জয়লাভ করতে চেয়েছেন।
কথাসাহিত্যিক মতি নন্দীর কিছু কিছু গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমাও তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘স্ট্রাইকার’, ‘কোনি’, ‘জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ’। ১৯৭৮ সালে অর্চন চক্রবর্তীর পরিচালনায় ‘স্টাইকার’; সরোজ দে পরিচালিত ১৯৮৬ সালে ‘কোনি’; ২০১৭ সালে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা অনিমেষ আইচ-এর পরিচালনায় ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রগুলি নির্মিত হয়।
কথাসাহিত্যিক মতি নন্দী বিশ্বাস করতেন, চেষ্টা করলে মানুষ বহু যন্ত্রণার মধ্যেও জিততে পারে। তিনি নির্মোহ চোখে জীবন ও তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখার উপাদান সংগ্রহ করে নিতেন। অনুজ লেখকদের কাছে তাঁর বক্তব্য, কোনো লেখা, লিখেই যেন ছাপাতে না দেন। তিন-চারমাস ফেলে রাখার পর, আবার পড়ার পর যদি মনে হয় লেখাটা ঠিকই আছে, তারপর যেন লেখাটা ছাপতে দেওয়া হয়। নিজের লেখা সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন, নিজের সম্পর্কে এটুকু বলতে পারি; অযত্নের লেখা কখনও ছাপতে দিইনি। শুরুতে বছর চারেক শুধু অনুশীলনই করেছি গল্প লেখার। ... কোনও একটা ব্যাপারে নাড়া খেয়েই বা সযত্নে প্লট তৈরি করে লিখতে বসা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ, যুক্তিবিরোধী, অনুভূতিশীল মনের নির্জ্ঞান অংশ লেখকের কাজের জন্যে নিজেদের ভূমিকা অবশ্যই পালন করবে। কিন্তু লেখকের সজ্ঞান মনও আছে এবং তা নিষ্ক্রিয় নয়। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বলতেন, মতি নন্দী লেখকদের লেখক। আর সন্তোষকুমার ঘোষ তাঁকে বলেছেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্থক উত্তরসূরি। আবার অনেকের কাছে তিনি খেলার সাংবাদিক হয়েই রয়ে গেছেন। তবে ব্যক্তি মতি নন্দী এইসব প্রশংসা নিন্দা কোনোদিনই গায়ে মাখেননি।
আলোচনার শেষে আমরা বলতে পারি যে, কথাসাহিত্যিক মতি নন্দীর গল্প-উপন্যাস পাঠককে এক ভিন্নস্বাদের কাহিনির খোরাক জুগিয়েছে। লেখক যেভাবে তাঁর রচনার মধ্যে খেলা এবং খেলার বিষয়কে, জয়পরাজয়কে, খেলার মনোভাবকে বা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রয়োগ করেছেন এবং সেইসঙ্গে এই পার্থিব জীবনে মানুষের মনের অন্তঃসলিলা চেতনাপ্রবাহকে, চরিত্রের অন্তরের স্বরূপকে যেভাবে উদ্ঘাটিত করেছেন, তারফলে তা তাঁকে এক অন্যতম স্বাতন্ত্র্য সাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর এখানেই তিনি আর পাঁচজন লেখকের থেকে আলাদা, স্বরাষ্ট্রে সম্রাট।
************************
ঋণ স্বীকার :
১. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (আধুনিক যুগ, ১৯৫০ - ২০০০) – ড. দেবেশ কুমার আচার্য্য।
লেখক পরিচিতি :
শ্রী লিল্টু মণ্ডল
বালিয়াপুর, লালগঞ্জ, আসানসোল।