ভালবাসার উপকথা : আদিবাসী কন্যা ফুলমণির প্রেমের পূর্ণতার কাহিনি

‘ভালবাসার উপকথা’ গল্পগ্রন্থটি এক অখ্যাত কবি ও গল্পকার সুকুমার পালের লেখা। গল্পগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সালে 'পদ্মাগঙ্গা' পাবলিকেশন থেকে। এই গল্পগ্রন্থে মোট ন’টি গল্প আছে, সেগুলি হলো – ‘সেই মন্দিরে দেবতা কোথায়’, ‘সাগর সঙ্গমে পুণ্যস্নান’, ‘শুনবে কে ?’, ‘আজগুবি নয়’, ‘দিনান্তের আলো’, ‘ভূতনাথের ভেল্কি’, ‘দুই ফুল’, ‘নিয়তির পরিহাস’, ‘ভালবাসার উপকথা’। গল্পকার সুকুমার পালের জন্ম ১ আগস্ট ১৯৫৩ সালে, ১৬ শ্রাবণ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দে সাঁওতাল পরগণা বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের নালা থানার অন্তর্ভুক্ত বড়রামপুর গ্রামে। এক মধ্যবিত্ত অসচ্ছল পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল কেটেছে মামাবাড়ি লছমনপুর গ্রামে। চুরুলিয়ার কবিতীর্থ স্কুলে পড়াশোনা শুরু । তারপর দুমকার এস.পি কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে কয়লা শিল্পের জোড়কুড়ি কোলিয়ারিতে যোগদান করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। অবশেষে ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিল্মিটেড-এর সোনপুর বাজারি প্রজেক্ট কয়লা শিল্পে দীর্ঘদিন দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকার পর ১৩ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া জেলার নালা থানার অন্তর্ভুক্ত নালা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে লেখালেখি নিয়েই বেশি সময় অতিবাহিত করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি কোলকাতা ও আঞ্চলিক বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে আসছেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘মহুয়া পলাশ’। তারপর প্রকাশিত হয় ‘উপলব্ধি’ (জানুয়ারি ২০১৬), ‘ঝরা পাতা’ (শুভ মহালয়া ১৪২২) ইত্যাদি। তাঁর প্রকাশিত প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ভালবাসার উপকথা’ (১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১০)।
     ‘ভালবাসার উপকথা’ গল্পগ্রন্থের শেষ গল্প হল ‘ভালবাসার উপকথা’। গল্পের শুরুতেই লেখক স্বল্প কথায় প্রেমের সংজ্ঞা-স্বরূপের বর্ণনা দিয়েছেন। তারপর তিনি কবি রহিমের পদের উদ্ধৃত করেছেন। পদটি হলো –
        “খয়ের, খুন, খাঁশী, খুশী, বৈর, প্রীতি, মধুপান
         রহি মন দবে ন দবে জানত সকল জহান।”
অর্থাৎ পদে উল্লেখিত উপাদানগুলোকে লুকিয়ে রাখা অসম্ভব। লুকিয়ে রাখার যত চেষ্টা করা হোক না কেন তার প্রকাশ ঘটবেই। আর এই সূত্র ধরেই তিনি কৌশলে আপন কাহিনি আমাদের কাছে ব্যক্ত করেছেন। কাহিনির শুরু মধ্যভাগ থেকে, এরপর তিনি বছর কুড়ি পিছিয়ে কাহিনির প্রথমভাগ শুনিয়েছেন। পুরো কাহিনিটি হলো এই –
     দেবজোড় গ্রামের জমিদার বংশের সন্তান প্রতাপনারায়ণ। তার পূর্বপুরুষেরা ছিলেন জমিদার। জমিদারী প্রথা লোপ পেলেও সেই প্রতাপ এখনও তাদের গ্রামে বহাল রয়েছে। প্রতাপনারায়ণের প্রতাপে তার এলাকার লোকজন তটস্থ কেননা জমিদারের রক্ত এখনও তার শরীরে প্রবহমান। তার দুই ছেলে, দীপ্তনারায়ণ ও প্রদীপ্তনারায়ণ। বড়ো ছেলে দীপ্তনারায়ণ ডানপিটে এবং ধূর্ত স্বভাবের। ছোট ছেলে সুদীপ্তনারায়ণ ঠিক তার উল্টো, শান্ত ও ধীর স্বভাবের। দীপ্তনারায়ণ গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা শেষ করে নালা হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে। স্কুল ছুটি থাকায় এখন সে বাড়িতে রয়েছে। একদিন সে তার বন্ধুদের সাথে মালঞ্চ পাহাড়ের মেলায় ঘুরতে যায়। সেখানেই তার পরিচয় হয় আদিবাসী কন্যা ফুলমণির সঙ্গে। ফুলমণিও তার পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে মেলায় গিয়েছিল। মেলাতে আগত ছেলেমেয়েদের মালঞ্চ পাহাড়ে উঠার উৎসাহ দেখা যায়। পাহাড়টি তিনটি চূড়া বিশিষ্ট। দীপ্তনারায়ণ বন্ধুদের সাথে পাহাড়ের দ্বিতীয় চূড়ায় উঠে দেখতে পায় একটা পাথারের চাতালে বসে এক কিশোরী মেয়ে কাঁদছে। মেয়েটির কাছে গিয়ে তার নাম এবং কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে, মেয়েটির নাম ফুলমণি। তার সঙ্গে যারা এসেছিল তারা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তারা বলেছে, বাড়ি গিয়ে তার বাবাকে খবর দিয়ে দেবে। কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেছে এখনও তার বাবা আসেনি। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে এবং পাহাড়ে বাঘ-ভাল্লুক থাকায় সে একা মেয়েমানুষ ভয়ে কাঁদতে বসেছে। সব শুনে দীপ্তনারায়ণ ফুলমণিকে আশ্বাস দেয় যে, সে ফেরার পথে তাকে পাহাড় থেকে নামিয়ে নিয়ে যাবে। দীপ্তনারায়ণ ডানপিটে হলেও তার কর্তব্যজ্ঞান আছে, তাই সে পাহাড়ে বেশি দেরি না করে তাড়াতাড়ি ফুলমণিকে নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসে। তারপর ফুলমণিকে মেলা ঘুরায়, জিলিপি খাওয়ায়। শেষে ফুলমণিকে জিজ্ঞাসা করে সে একা একা বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা। ফুলমণি জানায়, তাদের গ্রামের নদীর পাড়ে যে শাল গাছটা আছে সেটা পার করে দিলে সে একাই ঘর যেতে পারবে। শাল গাছের নীচে আছে আদিবাসীদের দেবতা মারাং বুরু’র থান। মারাং বুরুকে সে ভয় পায়। এরপর তারা ফুলমণিকে নিরাপদে পৌঁছে দেয় শাল গাছ পর্যন্ত। সেখানে পৌঁছে ফুলমণিকে গ্রামে ঢুকে টুঁ শব্দ করতে বলে। কিন্তু দীপ্তনারায়ণ তার হাতটা ধরেই থাকে। ফুলমণি বলে, হাত না ছাড়লে সে যায় কি করে। এতে দীপ্তনারায়ন বিহ্বল হয়, সে নিজেই বলে উঠে – “আমি তোর হাতটা এখনও ধরে আছি। আর না ছেড়েই বলছি—তুই যা ফুলমণি। কেমন আমি বলতো।” এই বলেই সে হা হা করে হাসতে থাকে। ফুলমণি গ্রামে পৌঁছে গেলে দীপ্তনারায়ণও বন্ধুদের সাথে বাড়ি ফিরে আসে।
     এরপর স্কুলের ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ায় দীপ্তনারায়ণকে আবার স্কুলের হোস্টেলে যাবার জন্য তৈরি হতে হয়। নালা হাইস্কুলে সে পড়াশুনা করে। হোস্টেলে এসেও দীপ্তনারায়ণের পড়াশুনা আর খেলাধূলাতে মন বসে না। খালি ফুলমণির চিন্তাতেই সবসময় ডুবে থাকে সে। এমনকি ক্লাস চলাকালীনও সে বিভোর হয়ে থাকে। এমনি একদিন সে স্কুল চত্বরে দেখতে পায় ফুলমণিকে, তার বাবার সাথে। নতুন বছরে ফুলমণিও নালা হাইস্কুলে দীপ্তনারায়নদের ক্লাসেই ভর্তি হয়। তারা নিজেদের সঙ্গ পেয়ে খুবই আনন্দিত হয়। এরপর তারা সবসময়ই নিজেদেরকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। নালা হাইস্কুল থেকে পাস করার পর তারা দু’জনে দুমকা শহরের এস.পি. কলেজে ভর্তি হয়। ফুলমণি ম্যাট্রিক পাস করে স্কলারশিপ নিয়ে। এখন তারা পরিণত মনের, দু’জনের দু’জনকে ভালো লাগে, তারা একে-অপরের সঙ্গ পেতে চায়। এরফলে তারা বেশিরভাগ সময়ই একসঙ্গে কাটায়। তারা কলেজ কামাই করে ময়ূরাক্ষী নদীর ওপর নির্মিত ম্যাশানজোর ব্যারেজ দেখতে যায়। সেখানে নিরিবিলিতে কাটায় সারাদিন, সেখানকার বড় পাথরের গায়ে তাদের প্রেমের সাক্ষীস্বরূপ নাম লিখে রাখে—‘ফুলদীপ’। কলেজ পাস করার পর ফুলমণি মহিলা প্রশিক্ষণ কলেজে ভর্তি হয় আর দীপ্তনারায়ণ বাড়ি ফিরে আসে। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হতে থাকে পুরনো দিনের জৌলুস। দীপ্তনারায়ণ এখন শিক্ষিত বেকার, বেকারত্বের জ্বালা তাকে ভেতরে ভেতরে অস্থির করে তোলে। মাঝেমধ্যে অস্থির বিচলিত মন বাগ না মানলে সে পাড়ি জমাত ম্যাশানজোর ব্যারেজে। ফুলমণির সাথে সচরাচর দেখার করার সুযোগও সহজ ছিল না সেই কালে। আরও কয়েক বছর কেটে যায়। ফুলমণি এখন একজন শিক্ষিকা। বাঁধনা পরবের ছুটি পড়ায় অনেক দিন পর ফুলমণি বাড়ি ফিরে আসে। সে এখন গ্রামের গর্ব। আদিবাসীদের বাঁধনা পরব দেখার জন্য দীপ্তনারায়ণ তাদের গ্রামে যায়। সেখানে তাদের উৎসবে যোগদান করে সে। এই সুযোগে ফুলমণির কাছে আসে তাদের মধ্যে কথার বিনিময় হয়। সারারাত ধরে বাঁধনা পরবের অনুষ্ঠান চলতে থাকে। অনুষ্ঠান শেষে তারা ছুটে চলে যায় নদীর ধারের মহুয়া গাছের তলায়। পরবের শেষ দিনে আদিবাসী সম্প্রদায়ের পুরুষদের মধ্যে শক্তির লড়াই বা প্রদর্শন হয়ে থাকে। সেই শক্তি প্রদর্শনের খেলায় নজর পরীক্ষা বা লক্ষ্যভেদ করা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ লড়াই। এই লড়াইয়ে যদি অকৃতকার্য হয় তাহলে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা অংশ গ্রহণ করতে পারে। আদিবাসী পুরুষেরা লক্ষ্যভেদে অসফল হলে সুযোগ আসে দীপ্তনারায়ণের কাছে। গুরুদেব, মারাংবুরু এবং দর্শকমণ্ডলীকে প্রণাম জানিয়ে দীপ্তনারায়ণ ধনুকে তীর যোজনা করে ঈশ্বরকে স্মরণ করে তীর ছেড়ে দেয়। তীর সোজা গিয়ে লক্ষ্যভেদ করলে উল্লাসে ফেটে পড়ে দর্শকমণ্ডলী। বৃদ্ধ মাঝি-মোড়ল জড়িয়ে ধরে দীপ্তনারায়ণকে। আদিবাসী সমাজ তাকে বছরের শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজের সম্মান জানায়, স্বীকৃতি স্বরূপ উপহার হিসেবে প্রদান করে ‘হলুদ রঙের পাগড়ি’। তারপর তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে বেরয় তারা। ধীরে ধীরে দীপ্তনারায়ণ ফুলমণিদের দরজার সামনে আসে। দীপ্তনারায়ণ ফুলমণির নাম ধরে ডাকতে থাকে বারবার। ডাক শুনে ছুটে বেরিয়ে আসে ফুলমণি। এই উৎসবের আনন্দের সময় দীপ্তনারায়ণ ফুলমণিকে ভুলে যায়নি। দীপ্তনারায়ণ তার মাথা থেকে পাগড়ি খুলে ফুলমণির মাথায় পরিয়ে দেয়। জানাই, তার জন্যই সে লক্ষ্যভেদ করতে পেরেছে, আজ যা কিছু সম্মান সবই ফুলমণির জন্যই। এতে ফুলমণি আপ্লুত হয়, খুশি হয় মনে মনে। দীপ্তনারায়ণকে আরও আপন বলে মনে হয় তার। উৎসবের শেষে সবাই ঘুমিয়ে গেলে তারা ছুটে চলে যায় গ্রাম পেরিয়ে নদীর ধারের মহুয়া গাছের তলায়। সেখানে একান্ত নিরিবিলিতে তারা দু’জনে মিলিত হয় বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে, কেউ কাউকে বাধা দেয় না। অনুকূল মোহময় পরিবেশে তারা একে-অপরকে সমর্পন করে সবকিছু। ভোরবেলায় পাখির কাকলিতে জেগে ওঠে তারা। ফুলমণি দীপ্তনারায়ণকে বাড়ি যেতে বলে, আর জানাই তাকেও এবার স্কুল ফিরে যেতে হবে তার ছুটি শেষ হয়ে গেছে। এই কথা শুনে দীপ্তনারায়ণ বিষন্ন হয়ে পড়লে ফুলমণি তাকে আশ্বাস দেয় সে আবার ফিরে আসবে এবং এইখানেই তাদের আবার দেখা-সাক্ষাৎ হবে।
     উপরে উল্লিখিত কাহিনির কুড়ি বছর পর ফুলমণি তার ছেলেকে নিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছে। সে এখন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা আর তার ছেলে এখন কৈশোর উত্তীর্ণ তরতাজা যুবক। সে উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করেছে এবং জয়েন্ট পরীক্ষায় ভালো র‍্যাঙ্ক করে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছে। অপরদিকে জমিদার প্রতাপনারায়ণও পীড়াপিড়ি করে ছেলে দীপ্তনারায়ণের বিয়ে দিয়েছেন। দীপ্তনারায়ণের বিবাহিতা স্ত্রীর নাম দেবলীনা। এত বছর পরেও তাদের কোনো সন্তানাদি হয়নি। সন্তান কামনায় তারা কখনো পেঁচালিয়া গ্রামের মা ভবতারিণীর মন্দিরে, কখনো গড়শিমুলিয়া গ্রামের কালীমাতার শ্রীচরণে মানত করেছেন। অন্যদিকে ডাক্তার, বৈদ্য, রোজা-কবিরাজ, গুণী-গোঁসাই, তাবিজ-কবচ করেও তারা কোনো ফল পাননি। গ্রামে ফিরে ফুলমণি খবর পাঠিয়েছে যে, সে তার ছেলেকে নিয়ে বিকালবেলায় জমিদার বাড়িতে দেখা করতে আসবে। জমিদার প্রতাপ নারায়ণ লোকমুখে কানাঘুষোয় শুনতে পান ফুলমণির সেই সন্তান নাকি দীপ্তনারায়ণের ঔরসজাত। নিজের ছেলের নামে এই অপবাদ শুনে প্রতাপ নারায়ণ তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। এই ঘটনা তিনি মানতে রাজি নন। কারণ, আসল ঘটনা তিনি জানেন না। দীপ্তনারায়ণ বাবা-মায়ের পীড়াপিড়িতে বিয়ে করলেও নিজের স্ত্রী দেবলীনার প্রতি বিমুখ ছিলেন। তার মনের মণিকোঠায় বিরাজিত ছিল শুধুই ফুলমণি। বাঁধনা পরবের পর সেই যে ফুলমণি গেছে আর ফিরে আসেনি। বহু খোঁজাখুঁজির পরও দীপ্তনারায়ণ তার প্রেমাস্পদ ফুলমণির কোনো হদিশ পায়নি। এরফলে সে গভীর আঘাত পায় এবং মনোদুঃখে নিজেকে শেষ করে দেবার জন্য নেশা আর জুয়োখেলায় নিজেকে নিমজ্জিত করে দেয়। এখন সে অসুস্থ, হৃদরোগী। ডাক্তার আশ্বাস দিয়েছেন অপারেশন করালে দীপ্তনারায়ণ পুরোপুরি সেরে উঠবে। তার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু অতগুলো টাকার জোগান দিতে পারবে না। এই কয়েক বছরে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রতাপনারায়ণের জমিদারীর আর সেকাল নেই। এখন তাদের পড়ন্তবেলা, আয়-উপার্জন সেরকম কিছুই নেই, তাই ওষুধের মাধ্যমে দীপ্তনারায়ণকে সুস্থ রাখতে হচ্ছে।
    বিকালবেলায় বাইরের বারান্দায় প্রতাপনারায়ণ নিজেই পাহারায় থাকেন এবং টানটান উত্তেজনায় ফুলমণির আসার অপেক্ষা করতে থাকেন। যথা সময়ে ফুলমণি তার ছেলেকে নিয়ে জমিদার বাড়িতে আসে এবং জমিদারবাবুকে প্রণাম করে। ছেলেকেও প্রণাম করতে বলে। প্রতাপনারায়ণ তাদের আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ফুলমণি তার ছেলের সাফল্যের কথা জানিয়ে জমিদারবাবুর এবং কর্তা-মায়ের আশীর্বাদ নিতে এসেছে একথা জানায়। প্রতাপনারায়ণ ফুলমণির ছেলের মুখে দীপ্তনারায়ণের আদল লক্ষ্য করলেও সেই চিন্তাকে প্রশ্রয় দেন না। তিনি ফুলমণিকে চিন্তে না পেরে তাদের গ্রামেরই কোনো প্রজার স্ত্রী হিসেবে ধরে নেন এবং তার ছেলেকে প্রাণ ভরে দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করেন আর সুন্দর ভবিষ্যতের কামনা করেন। এরপর তিনি তাদেরকে কর্তা-মায়ের আশীর্বাদ নিতে ভেতরে পাঠিয়ে দেন। কর্তা-মা পদ্মাবতী ফুলমণির ছেলে মুখে দীপ্তনারায়ণের ছেলেবেলার আদল দেখে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়েন। ফুলমণি কাছে এলে তিনি তার বিবরণ মন দিয়ে শুনেন। সে যে কুমারী মা এবং সে একাই সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলেছে, তারজন্য তিনি তার সাহস ও কর্মকে বাহবা জানিয়েছেন। কর্তা-মাও প্রথমে গ্রামের বধূই ভেবে ফুলমণি ও তার ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানান। এরপর তিনি যখন ফুলমণির আসল পরিচয় জানতে পারেন তখনই ভিন্ন মূর্তি ধারণ করেন এবং তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে কড়া নির্দেশ দেন। তারা বেরিয়ে যাবার আগে দীপ্তনারায়ণের সঙ্গে ফুলমণির দেখা হয়। দীপ্তনারায়ণ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ফুলমণিকে জড়িয়ে ধরে এবং অঝোরে দু’জনে কাঁদতে থাকে। এরপর মন কিছুটা শান্ত হয়ে এলে দীপ্তনারায়ণ তাকে এভাবে একা ফেলে যাবার কারণ ফুলমণিকে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায়, বাঁধনা পরবের ছুটির পর স্কুলে যাওয়ার কয়েকদিন পর সে জানতে পারে সে দীপ্তনারায়ণের ভ্রূণ তার গর্ভে। তখন সে কী করবে না করবে ভেবে কূল-কিনারা পায় না। কারণ সেই সময় একথা জানাজানি হলে সমাজ তাকে টিকতে দিতে না, সর্বত্র তার বদনাম ছড়িয়ে পড়ত। অপরদিকে জমিদারবাবুও এই সত্য মেনে নিতেন না। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় সবার অলক্ষ্যে চলে যাবে, যেখানে কেউ তার সম্পর্কে কৌতূহল বা জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। যেমন ভাবা তেমন কাজ, দুমকা-পাকুড় রোডের কোনো এক অখ্যাত গ্রামের স্কুলে সে ট্রান্সফার নিয়ে চলে যায়। সেখানেই তার সন্তানকে মানুষ করতে থাকে। সেই আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামে কেউ তাদের পরিচয় জানার জন্য তেমন উৎসাহ দেখায়নি। যদি বা কেউ জিজ্ঞাসা করেছে তখন সে বলেছে, তার স্বামী মিলিটারিতে অফিসার। বছরে একবার কি দু’বার বাড়িতে আসতে পায়। কাজের খুব চাপ থাকলে তাও আসতে পায় না। এইভাবে কুড়ি বছর পেরিয়ে যাবার পর সে তার ছেলেকে নিয়ে গ্রামে ফিরেছে। সেই কুড়ি বছরে সে দীপ্তনারায়ণকেই স্বামী মেনে নিয়েই সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে এসেছে। হিন্দু নারীর মতোই সে দীপ্তনারায়ণকে ‘তুই’ না বলে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে স্বামীর উপযুক্ত সম্মান দিয়ে এসেছে। এরপর ফুলমণি তার ছেলেকে জানায় দীপ্তনারায়ণই তার জন্মদাতা পিতা। দীপ্তনারায়ণের সঙ্গেও ছেলের পরিচয় করিয়ে দিয়ে, তার সাফল্যের কথা বলে তাকে আশীর্বাদ করতে বলেছে। জমিদার বাড়ি থেকে ফিরে আসার আগে ফুলমণি দীপ্তনারায়ণের যখন অসুস্থতার কথা জানতে পারে তখনই সে জানায় দীপ্তনারায়ণের চিকিৎসার সমস্ত খরচ সে একাই বহন করবে। ফুলমণি চলে যাবার পর কর্তা-মা ও জমিদার প্রতাপনারায়ণের মধ্যে ফুলমণি ও তার ছেলেকে নিয়ে কথা হয়। তাদের কথাবার্তায় সমাজের বক্রতার কথা, নিয়ম-কানুন, জাত-বিজাত ভেদাভেদের কথা উঠলে প্রতাপ নারায়ণ প্রতিবাদী হয়ে “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”। তবে একশ্রেনীর স্বার্থপর, পরশ্রীকাতর ও লম্পট মানুষকেই তার ভয়। তারা মানুষের ভালো দেখতে পারে না। তিলকে তাল করে সর্বত্র বদনাম রটিয়ে বেড়ায়। সেইরকমই গ্রামের এক ব্যক্তি হলো স্বপন কুমার ঘোষ। গ্রামের লোকেরা তাকে ‘মাল’ সম্বোধন করেই বেশি চেনে। সেখান থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পর এক চিঠির মারফৎ ফুলমণি কর্তা-মা পদ্মাবতী দেবীকে জানায়, তার ছেলেকে সে ডাক্তারি পড়ার জন্য কলেজে ভর্তি করিয়েছে এবং দীপ্তনারায়ণের চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ ভারতের সি.এম.সি. ভেলোরে যোগাযোগ করে রিজার্ভেশনও করে নিয়েছে। এবার তাদের অনুমতি পেলেই সে দীপ্তনারায়ণ ও দেবলীনাকে নিয়ে রওনা দেবে। একথা কর্তা-মা পুত্রবধূ দেবলীনাকে জানালে সে এককথায় রাজি হয়ে যায়। তারপর ফোনে ফুলমণির সঙ্গে কথা বলে তাদের সম্মতির কথা জানিয়ে দেয়। নির্দিষ্ট দিনে তারা ভেলোরে পাড়ি দেয়। অপরদিকে মালের কানে যখন একথা পৌঁছায় তখন তারা ভেলোরে পৌঁছে গেছে। তবু সে জমিদারের নামে দুর্নাম রটাতে কম চেষ্টা করেনি। অবশেষে সেই কথা প্রতাপ নাড়ায়ণের কানে উঠলে তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং হুঙ্কার দিয়ে জানান, তিনি এই ঠুনকো সমাজকে মানেন না। যখন ছেলেটা রোগশয্যায় থেকে মৃত্যুর দিন গুনছিল তখন কোথায় ছিল এই সমাজ। এ সমাজ শুধু দোষত্রুটিই দেখে, তার সমাধানে এগিয়ে আসে না। এরপর আমরা জানতে পারি ভেলোর থেকে দীপ্তনারায়ণ সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। সেখানে থাকার সময়ে তারা গাইনো-প্রবলেম নিয়েও চিকিৎসা করিয়েছে। তারই সুবাদে বৎসারান্তে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। ফুলমণির দান মেনে নিয়ে মেয়ের রাখা হয় ‘ফুলদানী’। দুঃখের দিনের পর সুখের দিন আসে, বিরহের পর আসে আনন্দ। ফুলমণির ছেলে ডাক্তারি পাস করেছে। সে এখন বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। কোলকাতার বড় হাসপাতালে প্র‍্যাক্টিস করছে। কিন্তু ফুলমণির আদেশ মাসে একদিন গ্রামের দুস্থ মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করতে হবে। নালা সদর আমবাগান সন্নিহিত এক সুন্দর বাড়িতে তার ডিসপেনসারি। এই কথা চাউর হতেই দলে দলে লোক এসে নাম লিখিয়ে বসে আছে। শুভ অক্ষয় তৃতীয়ার দিন উদ্‌ঘাটন সমারোহ। দরজার ফিতে কাটেন জমিদার প্রতাপ নারায়ণ চৌধুরী। নেমপ্লেটের আবরণ খোলা হলেই দেখতে পাওয়া যায় তাতে লেখা আছে ডাঃ সুদীপ্তনারায়ণ চৌধুরী, এম. এস. এফ. আর. সি. এস., কার্ডিও সার্জন। (হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ)। এরপর রোগী দেখার পালা, প্রথমেই দিদা পদ্মাবতী দেবী, তারপর দাদু প্রতাপনারায়ণের চিকিৎসা করার পর তৃতীয় ব্যক্তির নাম হিসেবে বেরিয়ে আসে স্বপন কুমার ঘোষ ওরফে মালের নাম। প্রতাপ নারায়ণ মালকে এর মধ্যে কোনো সুলুক-সন্ধানের খোঁজ করার কথা জানালে সে জানায় এ তো আমাদের গর্বের কথা। তার চিকিৎসা করার পর ডাঃ সুদীপ্তনারায়ণ জানায়, ‘মালদাদু’ - “লোকের ফাঁক-ফোঁকর দেখে কোন লাভ নেই। তার চেয়ে বরং নিজের ফাঁক-ফোঁকরগুলো বন্ধ করবার চেষ্টা কর।” এইভাবেই আনন্দ, খুশিতে ভরা দিনের সাথেই কাহিনির পরিসমাপ্তি ঘটে।
                **************************

আকরগ্রন্থ : 
১. ভালোবাসার উপকথা - সুকুমার পাল।

লেখক পরিচিতি :
শ্রী লিল্টু মণ্ডল
বালিয়াপুর, লালগঞ্জ, আসানসোল।

Popular posts from this blog

কথাসাহিত্যিক মতি নন্দী